সুন্দরবনের ত্রাস ও এক চতুর শিয়াল
সুন্দরবনের গহীন অরণ্য। যেখানে শ্বাসমূলগুলো
মাটির বুক চিরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর গোলপাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো সোনার গুঁড়োর মতো ঝরে পড়ে। এই বনের সৌন্দর্য যেমন অপরূপ, ঠিক তেমনই তার বিপদ। প্রতি পদক্ষেপে এখানে মৃত্যুর হাতছানি। বাঘের ডেরা, কুমিরের জল, আর বিষধর সাপের ফণা—সব মিলিয়ে এক রহস্যময় জগত।
এই বনের একচ্ছত্র অধিপতি ছিল এক বিশাল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। নাম তার ‘বজ্রনাদ’। নামের মতোই তার গলার আওয়াজ। সে যখন গর্জন করত, তখন সুন্দরবনের বাঘ-ভাল্লুক তো দূর, গাছের পাতারাও যেন ভয়ে কেঁপে উঠত। বজ্রনাদের গায়ের রং ছিল কাঁচা হলুদের মতো উজ্জ্বল, তার ওপর কালো ডোরাকাটা দাগগুলো যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা। কিন্তু তার এই রাজকীয় রূপের আড়ালে ছিল এক নিষ্ঠুর ও অহংকারী মন। সে নিজেকে বনের ঈশ্বর মনে করত। তার সামনে দিয়ে কোনো প্রাণী হেঁটে যাওয়ার সাহস পেত না। বিনা কারণে প্রাণী হত্যা করা আর দুর্বলদের ভয় দেখানোই ছিল তার বিনোদন।
অন্যদিকে, এই বনেরই এক কোণে বাস করত এক শিয়াল। নাম তার ‘চতুর’। চতুর ছিল শারীরিকভাবে দুর্বল, রোগা-পটকা। তার গায়ের লোমগুলোও ছিল উসকো-খুসকো। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তাকে গায়ের জোর না দিলেও, মাথায় দিয়েছিলেন এক অদ্ভুত বুদ্ধি। বনের সবাই যখন বজ্রনাদের ভয়ে তটস্থ, চতুর তখন নিজের বুদ্ধির জোরে দিব্যি টিকে ছিল। তবে সমস্যা হলো, গত কয়েকদিন ধরে চতুরের পেটে তেমন কিছু পড়েনি। একে তো খরা, তার ওপর বজ্রনাদের উৎপাতে শিকার মেলা ভার।
একদিন দুপুরে, চতুর এক ঝোপের আড়ালে বসে নিজের কপাল চাপড়াচ্ছিল। ক্ষিদেয় তার পেট চোঁ-চোঁ করছে। হঠাৎ তার নাকে এল এক তীব্র গন্ধ—বাঘের গায়ের গন্ধ! চতুর সচকিত হয়ে উঠল। পালাবার পথ খুঁজবে, এমন সময় ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল স্বয়ং বজ্রনাদ।
বজ্রনাদের চোখ দুটো জ্বলছিল আগুনের গোলার মতো। সে চতুরের দিকে তাকিয়ে এক বিকট হাসি দিল। সেই হাসিতে বনের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল।
"কি রে চতুর! এখানে লুকিয়ে আছিস?" বজ্রনাদ হুঙ্কার দিয়ে বলল। "আজ আমার সকালের নাস্তাটা করা হয়নি। তোকে দিয়েই কাজটা সেরে ফেলি কী বলিস?"
চতুরের প্রাণপাখি তখন খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। সে জানে, দৌড়ে বাঘের সাথে সে পারবে না। তার বাঁচার একটাই উপায়—বুদ্ধি। চতুর সাথে সাথে মাটিতে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে শুয়ে পড়ল।
"মহারাজ! মহারাজ, আমাকে খাবেন? এ তো আমার পরম সৌভাগ্য!" চতুর গদগদ গলায় বলল। "কিন্তু মহারাজ, আমাকে খেয়ে আপনার ওই বিশাল পেটের এক কোণাও ভরবে না। আমি তো হাড় আর চামড়া ছাড়া কিছুই নই। তার চেয়ে বরং একটা দারুণ খবর দিই আপনাকে। এমন খবর যা শুনলে আপনার মন ভরে যাবে, আর পেট ভরার ব্যবস্থাও হবে রাজকীয়ভাবে।"
বজ্রনাদ থমকে গেল। সে ভোজনরসিক তো বটেই, কিন্তু তার লোভও কম নয়। সে বলল, "কী খবর? যদি মিথ্যে হয়, তবে তোকে চিবিয়ে খাব না, জ্যান্ত গিলে খাব!"
চতুর উঠে দাঁড়িয়ে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, "মহারাজ, আপনি তো এই বনের রাজা। কিন্তু আপনি কি জানেন, বনের গভীরে যে প্রাচীন বটগাছটি আছে, সেখানে দেবতারা আপনার জন্য এক উপহার পাঠিয়ে রেখেছেন?"
"উপহার? কীসের উপহার?" বাঘের গলায় কৌতূহল।
"মহারাজ, সে এক জাদুকরী মাদল বা ঢোল। দেবরাজ ইন্দ্র নিজে সেই ঢোল পাঠিয়ে রেখেছেন। জনশ্রুতি আছে, যে বীর ওই ঢোলে ঘা দিতে পারবে, তার গর্জনে আকাশ-বাতাস কাঁপবে এবং সে হবে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী। আর সেই ঢোল থেকে বেরিয়ে আসবে অমৃত সমান খাবার।"
লোভী বাঘের জিভে জল এসে গেল। সে বলল, "সত্যি বলছিস? চল তো দেখি কোথায় সেই ঢোল!"
চতুর মনে মনে হাসল। তার ফাঁদ তৈরি। সে বলল, "চলুন মহারাজ, আমি পথ দেখাচ্ছি।"
যাত্রাপথ
ও চতুরের
পরিকল্পনা
বজ্রনাদকে নিয়ে চতুর বনের গহীনে যাত্রা শুরু করল। পথটা ছিল বেশ দুর্গম। কাঁটাঝোপ, লতাপাতা আর কাদামাটি পেরিয়ে তারা এগিয়ে চলল। চতুর আগে আগে, বজ্রনাদ পেছনে। বাঘের মনে তখন অফুরন্ত শক্তির স্বপ্ন। সে ভাবছে, ওই ঢোল বাজালে সে হয়তো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তখন বনের বাইরের মানুষরাও তাকে ভয় পাবে।
চতুর পথ চলতে চলতে নানা গল্প ফেঁদে বসল।
"জানেন মহারাজ, গত পরশু এক হাতি ওই ঢোল বাজাতে গিয়েছিল। কিন্তু বোকা হাতি কি আর আপনার মতো শক্তিশালী? সে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে।"
"তাই নাকি?" বাঘ গর্বিত স্বরে বলল, "হাতির কি আর সেই যোগ্যতা আছে? আমি হলাম রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার!"
চতুর বলল, "একদম ঠিক মহারাজ! ওই ঢোল শুধু আপনার মতো রাজকীয় থাবার স্পর্শ পাওয়ার জন্যই অপেক্ষা করছে।"
এভাবে চলতে চলতে তারা এসে পৌঁছাল বনের সবচেয়ে প্রাচীন ও নির্জন অংশটিতে। এখানকার গাছগুলো এত বিশাল যে আকাশ দেখা যায় না। পরিবেশটা থমথমে, রহস্যময়। সূর্যের আলো এখানে খুব কম পৌঁছায়, কিন্তু আজ বিকেলের পড়ন্ত রোদ গাছপালার ফাঁক দিয়ে অদ্ভুত এক মায়াবী আলো তৈরি করেছে।
সামনেই দেখা গেল সেই বিশাল বটগাছটি। শত শত বছরের পুরনো গাছ। তার ঝুরিগুলো মাটি ছুঁয়ে নতুন নতুন গাছের জন্ম দিয়েছে। গাছটি যেন একাই একটা জঙ্গল। আর সেই গাছের একটি মোটা ডালে ঝুলছে এক বিশাল আকৃতির বস্তু।
বস্তুটি দেখতে কালচে খয়েরি রঙের, আকৃতিতে অবিকল একটি বিশাল ঢোল বা মাদলের মতো। সূর্যের আলো পড়ে সেটি চকচক করছে। কিন্তু ওটি কোনো ঢোল ছিল না—ওটি ছিল সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর বিষাক্ত মৌমাছির চাক। লক্ষ লক্ষ মৌমাছি সেখানে বাসা বেঁধেছে। চাকটি এত বড় যে দূর থেকে দেখলে সত্যিই মনে হয় কোনো দানবীয় বাদ্যযন্ত্র।
চতুর দূর থেকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, "ওই দেখুন মহারাজ! দেবতাদের সেই জাদুকরী ঢোল। দেখছেন না কেমন চকচক করছে? এর ভেতরেই আছে অফুরন্ত মধু আর ক্ষমতা।"
বজ্রনাদ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। সত্যিই তো! এত বড় জিনিস সে আগে কখনো দেখেনি। সে বলল, "বাঃ! চমৎকার! আজ আমি ওটা বাজাবই।"
চতুর সতর্ক করে বলল, "মহারাজ, একটু দাঁড়ান। কাছে যাওয়ার আগে কিছু নিয়ম আছে। দেবতারা বলেছেন, এই ঢোল বাজাতে হলে খুব জোরে, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে থাবা মারতে হবে। আস্তে মারলে কোনো শব্দ হবে না, আর খাবারও বের হবে না।"
বাঘ বলল, "আরে ওসব আমাকে শেখাতে হবে না। আমার এক থাবায় মহিষের ঘাড় মটকে যায়, আর এ তো সামান্য এক ঢোল!"
চতুর বলল, "সে তো জানি মহারাজ। তবে আরেকটা কথা, আমি তো ছোট প্রাণী, ওই ঢোলের আওয়াজ আমি সহ্য করতে পারব না। আমার কান ফেটে যেতে পারে। তাই আমি ওই পেছনের ঝোপের আড়ালে গিয়ে আশ্রয় নিই। আপনি যখন বাজাবেন, আমি দূর থেকে সেই ঐশ্বরিক শব্দ শুনব।"
বোকা বাঘ রাজি হলো। সে বলল, "যা, তুই পালা। আমি এখন আমার ক্ষমতার প্রদর্শনী করব।"
সেই মাহেন্দ্রক্ষণ (The Dynamic Scene)
চতুর পা টিপে টিপে পেছনের একটি ঘন ঝোপের আড়ালে গিয়ে লুকাল। সেখান থেকে সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল পুরো দৃশ্যটি। এখন যে দৃশ্যটি ঘটতে যাচ্ছে, তা দেখার জন্য সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।
বজ্রনাদ ধীরে ধীরে সেই বিশাল বটগাছটির দিকে এগিয়ে গেল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে রাজকীয় ভাব। সে নিজেকে প্রস্তুত করল। তার পেশিবহুল শরীর টানটান হয়ে উঠল। গায়ের ডোরাকাটা দাগগুলো বিকেলের সোনালী আলোয় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে লেজটা আছাড় মারল মাটিতে, যেন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সে গাছের নিচে গিয়ে পেছনের দু'পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বিশাল আকৃতির মৌমাছির চাকটি তার ঠিক নাগালের মধ্যেই ঝুলছে। চাকটি দেখতে সত্যিই অদ্ভুত সুন্দর—যেন প্রকৃতির তৈরি এক নিখুঁত শিল্পকর্ম। কিন্তু এর ভেতরে যে মৃত্যু ফিসফিস করছে, তা বোঝার ক্ষমতা অহংকারী বাঘের ছিল না।
চতুর ঝোপের আড়াল থেকে মিটমিট করে হাসছিল। তার চোখ-মুখে এক পৈশাচিক আনন্দ। সে মনে মনে বলল, "নাও মামা, এবার বোঝো ঠেলা!"
দৃশ্যটি যেন থমকে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
গহীন জঙ্গল। বিশাল বটগাছ। তার নিচে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী প্রাণী।
বজ্রনাদ এক বিশাল হুঙ্কার দিল— "হালুম!"
সেই হুঙ্কারের সাথে সাথেই সে তার ডান হাতের বিশাল থাবাটি তুলল। তার থাবার নখগুলো বেরিয়ে এল, যেন একেকটি ধারালো ছুরি। সে তার সমস্ত গায়ের জোর একত্র করে সেই ঝুলন্ত 'ঢোল'-এর ওপর আঘাত হানল।
"ধপাস!"
এক বিকট শব্দ হলো। কিন্তু সেটি কোনো বাদ্যযন্ত্রের
সুরেলা শব্দ নয়। নরম মোমের চাক ভাঙার ভোঁতা এক শব্দ। বাঘের থাবা চাকের অনেকটা ভেতরে ঢুকে গেল। মধু আর মোম ছিটকে পড়ল তার সারা গায়ে।
আর ঠিক তার পরমুহূর্তেই শুরু হলো আসল গান।
"ভন ভন ভন ভন..."
চাকের ভেতর থেকে কালো ধোঁয়ার মতো বেরিয়ে এল লক্ষ লক্ষ ক্রুদ্ধ মৌমাছি। তাদের ঘর ভাঙা হয়েছে, তাদের রানীর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানো হয়েছে। তারা এখন প্রতিশোধ নিতে উন্মাদ।
মুহূর্তের মধ্যে সেই রোমান্টিক দৃশ্য এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো।
প্রম্পটের সেই দৃশ্যটি এখন বাস্তবে রূপ নিল।
· বিশাল বটগাছ (Massive Banyan Tree): তার ডালপালা যেন আকাশ ঢেকে রেখেছে। ঝুরিগুলো দোল খাচ্ছে বাতাসের তালে।
· মৌমাছির চাক (Massive Beehive like a Drum): চাকটি ভেঙে একাকার, সেখান থেকে মধু গড়িয়ে পড়ছে, আর তাকে ঘিরে আছে কালো মেঘের মতো মৌমাছির দল।
· রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার
(Royal Bengal Tiger): বজ্রনাদ এখন আর সেই অহংকারী ভঙ্গিতে নেই। তার মুখে আতঙ্কের ছাপ। সে লাফিয়ে পিছিয়ে আসার চেষ্টা করছে, কিন্তু হাজার হাজার মৌমাছি তাকে ঘিরে ধরেছে। তার থাবাটি এখনো শূন্যে তোলা, চোখেমুখে বিস্ময় আর যন্ত্রণার ছাপ। তার কমলা-কালো শরীরের ওপর মৌমাছিদের কালো আস্তরণ।
· গতিশীল দৃশ্য (Dynamic Action): বাঘটি লাফ দিচ্ছে, মৌমাছিরা উড়ছে, গাছের পাতা কাঁপছে—সব মিলিয়ে এক অস্থির উত্তেজনা।
· রঙের খেলা (Vibrant Colors): বিকেলের কমলা রোদ, বাঘের উজ্জ্বল হলুদ-কালো শরীর, গাছের গাঢ় সবুজ পাতা, মধুর সোনালী আভা, আর মৌমাছিদের কালো রং—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব অথচ ভয়ংকর দৃশ্যপট।
· চতুর শিয়াল (Fox watching with sly smile): পেছনের ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে চতুর। তার মুখে সেই বিখ্যাত কুটিল হাসি। সে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তার পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন দেখছে। তার চোখগুলো চকচক করছে বুদ্ধির দীপ্তিতে।
বাঘের
দুর্দশা ও পলায়ন
মৌমাছির হুল যে কত যন্ত্রণাদায়ক,
তা বজ্রনাদ হাড়ে হাড়ে টের পেল। এক সেকেন্ডের মধ্যে কয়েকশ হুল বিঁধল তার নাকে, কানে, চোখের পাতায়। বাঘের চামড়া মোটা হলেও নাকের ডগা আর চোখের পাশটা তো নরম! সেখানে হুল ফুটতেই বাঘটি ব্যথায় পাগল হয়ে গেল।
"ওরে বাবা রে! মরে গেলাম রে!" বলে চিৎকার করতে করতে বজ্রনাদ লাফাতে শুরু করল। সে থাবা দিয়ে বাতাস কাটতে লাগল, কিন্তু বাতাসের সাথে কি আর যুদ্ধ করা যায়? মৌমাছিরা তার কানের ফুটো দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করছে, লেজের নিচে কামড়াচ্ছে।
বজ্রনাদ বুঝল, এখানে এক মুহূর্ত থাকলে সে আর জ্যান্ত ফিরবে না। সে লেজ গুটিয়ে উল্টো দিকে দৌড় দিল। কিন্তু মৌমাছিরা কি আর তাকে সহজে ছাড়ে? তারাও বাঘের পিছু নিল।
বনের রাজা, যে বাঘকে দেখে সবাই পথ ছেড়ে দিত, আজ সে পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে। ঝোপঝাড় মাড়িয়ে, কাঁটার আঁচড় খেয়ে সে ছুটছে।
"চতুর! তুই আমাকে ধোঁকা দিয়েছিস! আমি তোকে দেখে নেব!"—চিৎকার করতে চাইল সে, কিন্তু মুখ খুলতেই কয়েকটা মৌমাছি মুখের ভেতর ঢুকে গেল। সে মুখ বন্ধ করে শুধু গোঙাতে লাগল।
দৌড়াতে দৌড়াতে সে সামনে পেল এক কাদাভর্তি খাল। কোনো উপায় না দেখে সে ঝাঁপ দিল সেই খালের পচা কাদায়। পুরো শরীর ডুবিয়ে দিল জলের নিচে, শুধু নাকের ডগাটা একটু বের করে রাখল শ্বাস নেওয়ার জন্য।
মৌমাছিরা খালের ওপর কিছুক্ষণ ভনভন করে ঘুরল। বাঘকে দেখতে না পেয়ে, এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় তারা ধীরে ধীরে ফিরে গেল তাদের ভাঙা চাকে।
বজ্রনাদ প্রায় ঘণ্টাখানেক সেই কাদার মধ্যে ডুবে রইল। তার রাজকীয় রূপ তখন আর নেই। সে কাদায় মাখামাখি এক অদ্ভুত জীবে পরিণত হয়েছে। তার মুখ ফুলে ঢোল হয়ে গেছে—সত্যিকারের ঢোলের মতোই। চোখ দুটো ছোট হয়ে গেছে, নাকটা লাল টকটকে। সারা শরীরে অসহ্য জ্বালা।
চতুরের
জয় ও বনের নতুন সকাল
এদিকে চতুর শিয়াল তখনো সেই বটগাছ থেকে একটু দূরে এক নিরাপদ টিলায় বসে ছিল। সে দেখল বাঘ কীভাবে লেজ গুটিয়ে পালাল। সে হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল।
"হায় রে বনের রাজা! গায়ে জোর থাকলেই রাজা হওয়া যায় না, মগজে বুদ্ধিও থাকতে হয়," চতুর নিজের মনেই বলল।
সে ধীরে ধীরে বটগাছের কাছে গেল। চাক ভেঙে অনেক মধু নিচে পড়েছিল। বাঘের ভয়ে বা মৌমাছির ভয়ে অন্য প্রাণীরা কেউ এদিকে আসেনি। চতুর খুব আয়েশ করে সেই তাজা মধু চেটেপুটে খেল। তার অনেকদিনের ক্ষিদে মিটল। তাও আবার বাঘকে বোকা বানিয়ে! এর চেয়ে সুস্বাদু খাবার আর কী হতে পারে?
সন্ধ্যা নেমে এল সুন্দরবনে। জোনাকিরা জ্বলতে শুরু করল। চতুর শিয়াল পেট ভরে খেয়ে শিস দিতে দিতে নিজের গর্তের দিকে রওনা দিল। সে জানত, বজ্রনাদ অন্তত আগামী এক সপ্তাহ আর এই এলাকায় আসবে না। আর এলেও তাকে চেনার উপায় থাকবে না, মুখ যা ফুলেছে!
পরদিন সকালে সুন্দরবনের প্রাণীরা দেখল এক অদ্ভুত দৃশ্য। তাদের সেই ভয়ংকর রাজা, বজ্রনাদ, চুপচাপ এক কোণায় বসে আছে। তার সেই দাপট নেই, গর্জন নেই। মুখটা ফোলা, চোখেমুখে করুণ ভাব। কেউ তাকে দেখে আর ভয় পাচ্ছে না, বরং আড়ালে মুচকি হাসছে।
বজ্রনাদ বুঝতে পারল, তার সম্মানের বেলুন ফুটো হয়ে গেছে। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, আর কখনো না বুঝে লোভে পা দেবে না। আর চতুর শিয়াল? তাকে দেখলেই সে এখন উল্টো পথে হাঁটে। কারণ সে বুঝে গেছে, এই ছোট্ট প্রাণীটির মাথায় যে 'অস্ত্র' আছে, তা তার নখ আর দাঁতের চেয়েও অনেক বেশি ধারালো।
এভাবেই সুন্দরবনের ইতিহাসে লেখা হলো এক নতুন অধ্যায়। যেখানে এক বিশাল বাঘ হার মেনেছিল এক ছোট্ট শিয়ালের বুদ্ধির কাছে। আর সেই সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রইল হাজার বছরের পুরনো সেই বটগাছ, যার ডালে ঝুলছিল সেই 'মায়াবী মাদল'।
গল্পের সারাংশ (Image Context):
গল্পের মূল ক্লাইম্যাক্সটি আপনার দেওয়া ছবির বর্ণনাকে কেন্দ্র করেই তৈরি। বিশাল বটগাছ, ড্রামের মতো মৌমাছির চাক, বাঘের থাবা মারা, মৌমাছির আক্রমণ এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে
চতুর শিয়ালের মুচকি হাসি—সবকিছুই গল্পের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে এসেছে। রঙের ব্যবহার এবং অ্যাকশন দৃশ্যগুলো গল্পের গতিশীলতা বজায় রেখেছে।
গল্পটি কি আপনার মনের মতো হয়েছে?

0 Comments